১৪ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ |
  • প্রচ্ছদ
  • মতামত
  • শিক্ষকের হাত ধরেই শিক্ষার রূপান্তর
  • শিক্ষকের হাত ধরেই শিক্ষার রূপান্তর

    মুক্তি কন্ঠ

    রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন অনুযায়ী, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য রয়েছে ম্যানেজিং কমিটি। এ ম্যানেজিং কমিটির কাজ কী?

    কোনোদিন কি কোথাও কেউ আলোচনা করেছে? কোথাও কি কোনো প্রশিক্ষণ হয়েছে? কোনোদিন কোনো কমিটির সদস্য জানতে চেয়েছেন, তাদের দায়িত্বটা কী? তাহলে ম্যানেজিং কমিটির দৌরাত্ম্যের দায়ভার কার? শুধু প্রশ্নই থেকে যাবে, উত্তর পাওয়া যাবে না। ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা শুধু খুঁজে বেড়াবেন প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বা কোনো শিক্ষকের ত্রুটি। বিভিন্ন কাজে খবরদারি করার পাশাপাশি তাদের কতটুকু মূল্যায়ন করা হলো, তা নিয়ে কথা বলা এবং সমালোচনা করা। এগুলোকে প্রধান কাজ মনে করে প্রতিষ্ঠানে লেগে থাকা।

    লক্ষ্যবিহীন যাত্রায় কোনোভাবেই অগ্রসর হওয়া বা সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছা সম্ভব হয় না। আবার অভিভাবকহীন কোনো মানুষ, কোনো পরিবার, কোনো সমাজ, কোনো জাতি, কোনো রাষ্ট্র লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। উন্নতির শিখরে পৌঁছানো তো আরও অসম্ভব। ঠিক তেমনি আমাদের বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা পরিবার। বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা পরিবারের প্রকৃত অভিভাবক কে-খুঁজে বেড়াই; কিন্তু কোথাও পাইনি আমি।

    তবে এর যে ব্যতিক্রম নেই, তা নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ কাজগুলো হয়। আমার প্রতিষ্ঠান বা পার্শ্ববর্তী দু-একটা প্রতিষ্ঠানে দেখেছি, ম্যানেজিং কমিটি কীভাবে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এমনকি যৌন হয়রানি থেকে ছাত্রীদের কীভাবে মুক্ত রাখা যায়, সে চেষ্টা অবিরাম চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ব্যতিক্রম কোনো কিছুকে নিয়ে তো সমাজ বা দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। আর তখন তারাও যোগ্য অভিভাবক হিসাবে স্বীকৃতি পাবেন না।

    তারপর ধরা যাক, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মহোদয়ের কথা; তিনি কি বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিভাবক? আমরা যদি তাদের কার্যক্রম নিয়ে একটু আলোচনা করি, তাহলে দেখতে পাই-তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের কাজের সমন্বয় করতে গিয়ে বছরের বেশির ভাগ সময় শেষ করেন। তারা শিক্ষকদের ভালো-মন্দ বলার প্ল্যাটফরম পান না। এমপিওর কাজ, উপজেলার বিভিন্ন দিবস পালনের আয়োজন করা-এসব নিয়ে তারা বেশ ব্যস্ত। তা ছাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতায় সময় দেন। এ অবস্থায় কয়টি প্রতিষ্ঠানের সমস্যার কথা তাদের কাছে বলতে পারবেন? হয়তো দু-চারটা। মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মহোদয়ের শিক্ষকদের অভিভাবকত্ব করার সময়-সুযোগ কোনোটাই নেই। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মতো জনবল কাঠামো বৃদ্ধি করা আবশ্যক বলে মনে করি।

    জেলা শিক্ষা অফিসার মহোদয়ের কথা বলতে গেলে এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি জেলায় কমপক্ষে ১০-১২টি উপজেলা থাকে। আবার একটি উপজেলাগুলোয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি কমপক্ষে ১০০টি থাকে, তবে তার আওতায় থাকে কমপক্ষে ১২০০-১৪০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন তিনি যদি ২টি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন; তবুও সময় লাগবে ৬০০-৭০০ দিন। অর্থাৎ প্রায় দুবছর। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করার মধ্যেই তো শুধু তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নয়। তাই তার পক্ষে কি সম্ভব মাধ্যমিক শিক্ষার অভিভাবকত্ব করা? তবে কেন এ ক্ষেত্রে জনবল বৃদ্ধি করা হয় না, এটা আমার বোধগম্য নয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি কেউ বছরে একবারের জন্যও না যেতে পারেন, তবে কীভাবে তিনি সেসব প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করবেন?

    আঞ্চলিক পরিচালক মহোদয়ের আওতায় তো আরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কাজেই এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া আরও অসম্ভব। অনেকেই হয়তো বলবেন, এসব কথা কেন লিখছি। লিখছি শুধু আমরা বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যে বাস্তবিকই অভিভাবকহীন, সেটা বলার জন্য। আজকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা খুব ভালো না, এটা স্বীকার করতে হবে। গুণগত মানের শিক্ষা শুধু মুখে বলে লাভ নেই, কার্যত না হলে। একটা পরিবারে যদি অভিভাবক না থাকে, সে পরিবারের পক্ষে উঠে দাঁড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে খুশি করাতে একটু বেশি সময়, শ্রম ও জ্ঞান ব্যয় করেন। কারণ তাদের প্রমোশনের সিস্টেম রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খুশি না হলে তো একটু সমস্যাই। আমাদের মতো চুনোপুঁটিকে দেখলে তাদের কাজ হবে না।

    প্রতিবছর একটা নির্ধারিত সময়ে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ কর্মসূচি শুরু হয়। সেখানেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। কারণ, এ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অনেকেই প্রমোশন পেয়ে আবার তাদের সহকর্মী হিসাবে কাজ করবে। তাই তাদের সঙ্গে রিলেশন ভালো রাখা মনে হয়। শিক্ষা সপ্তাহের প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ হওয়ার জন্য চলে সুপারিশ। প্রশ্ন হলো, শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সুপারিশ লাগবে কেন? এমন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন মানে বিবেকের কাছে হেরে যাওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। আর যিনি সুপারিশ করেন, তার বিবেক বুদ্ধিই বা কতটা-তিনি যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে সুপারিশ করেন তার স্বজন বা পরিচিতজনকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়ার জন্য! এ ক্ষেত্রে বিচার বিশ্লেষণে আরও কঠোর হওয়া আবশ্যক বলে মনে করি।

    তাছাড়া গত বছর যারা বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হলেন, তাদের মধ্যে আবার কারিগরি শাখা বাদ দিয়ে অন্য শিক্ষকদের দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। কারিগরি শাখার শিক্ষকদের অপরাধ কোথায় বুঝতে পারিনি। নিশ্চয়ই সমন্বয়ের অভাব। এটা শুধু কারিগরি নয়। একটি শিক্ষাব্যবস্থাকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। অথচ ছুটি, পরীক্ষা এগুলোতে কোনো সমন্বয় নেই। একজন অভিভাবকের দুটি সন্তান। একজন প্রাইমারি, একজন মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত। যখন ছুটি হয় প্রাইমারি প্রতিষ্ঠানের, তখন মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা। এতে যে কারণে ছুটি দেওয়া হলো, তা কি সঠিক কাজে লাগানো সম্ভব? এর জন্য দায়ী কে?

    শিক্ষা সপ্তাহের পুরস্কার দেওয়া হয় গতানুগতিক একটি ক্রেস্ট, একটি সার্টিফিকেট। ওই ক্রেস্ট রাখার মতো জায়গাও অনেকের নাই। এটা পরিবর্তন করা যাবে না, এমন তো কিছু নয়। শিক্ষকদের অভিভাবক হয়ে এসব কথা বলার মতো কোনো অভিভাবক নাই। গতানুগতিক ক্রেস্ট না হয়ে হতে পারে ৫-১০ হাজার টাকার চেক অথবা নগদ অর্থ। এ কথা কে বলবে শিক্ষকদের অভিভাবক হয়ে? সবাই এড়িয়ে যান-বলার পর আবার কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চক্ষুশূল হয়ে না যান, এই ভয়ে!

    শিক্ষক সমিতি কি আমাদের অভিভাবক? না, হতে পারেনি। কারণ, এখানে তাদের প্রয়োজন নেই। কারণ, এতে কোনো সুফল নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, পদ-পদবি নিয়ে তারা ব্যস্ত। শিক্ষকদের নিয়ে তাদের ভাববার সময় নেই। সবশেষে বলতে চাই-শিক্ষকের উন্নয়ন হলে শিক্ষার উন্নয়ন হবেই হবে। কারণ, শিক্ষকের হাত ধরেই শিক্ষার রূপান্তর ঘটে থাকে।

    প্রধান শিক্ষক, হালিমুন্নেছা চৌধুরাণী মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, ভালুকা, ময়মনসিংহ