১৪ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ |
  • প্রচ্ছদ
  • মতামত >> রাজনীতি >> লাইফস্টাইল
  • অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের মানুষ বঙ্গমাতা
  • অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের মানুষ বঙ্গমাতা

    মুক্তি কন্ঠ

    অসাধারণ নারী খনা কৃষি চাষে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে কৃষকের কাছে অবিস্মরণীয় মানবী হয়ে উঠেছিলেন। কৃষি বিষয়ে তাঁর জ্ঞানকে সহ্য করতে পারেননি তাঁর শ্বশুর। তিনি তাঁর ছেলে মিহিরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন খনার জিহ্বা কেটে ফেলার জন্য। মিহির বাবার নির্দেশ পালন করেছিলেন।

    মৃত্যু হয়েছিল খনার, কিন্তু এখন পর্যন্ত টিকে আছে খনার বচন। অসংখ্য কৃষিবিষয়ক বচনের পাশে তাঁর একটি বচন এমন : 

    ‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ

    ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।’

    ফজিলাতুন নেছাকৃষিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয় ফসলের উৎপাদন। ফসলের সঙ্গে যুক্ত হয় গোলাভরা ধান, থালাভরা ভাত।

    যুক্ত হয় সাধারণ মানুষের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার অধিকার। এর পরে আমরা স্মরণ করি মুসলিম মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থায় অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়াকে। তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে মেয়েদের স্কুলে এনে রক্ষণশীলতার গণ্ডি ভেঙেছিলেন। সমাজকে জেন্ডার সমতার মুখোমুখি করেছিলেন।
     

    এভাবে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নারী তার জ্ঞান দিয়ে পরিচর্যা করেছে সমাজকে। এগিয়েছে সমাজের স্রোত। আজকে এই ধারাবাহিকতায় স্মরণ করি একজন অসাধারণ প্রজ্ঞার মানুষ শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে একজন সাহসী নারী। দুর্বার সাহসে ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে দিয়েছিলেন দূরদর্শী চিন্তার বার্তা।

    সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ ফেলার সাহসী বার্তা তাঁকে ইতিহাসের মানুষ করেছে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, জেন্ডার সমতার ইতিহাসে তিনি আমাদের অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের মানুষ। ব্যক্তিজীবন থেকে রাজনৈতিক জ্ঞানের জায়গায় তিনি জেন্ডার সমতার বলয় তৈরি করেছিলেন স্বামী জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে দাঁড়িয়ে। দুজনের পরিশীলিত জীবনের নানা সূত্রে কোথাও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের জায়গা তৈরি হয়নি। বাংলার জনজীবনে এ এক দিগন্তবিথারি উদ্ভাসন। জেন্ডার সমতার আলোয় ঝরেছে টুঙ্গিপাড়ার বাড়ির প্রাঙ্গণে অজস্র শিউলি। 

    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি রচনা করেন জেলখানায় রাজবন্দি থাকার সময়। তিনি এই বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠার দ্বিতীয় লাইনে স্ত্রী ফজিলাতুন নেছার কথা লিখেছেন : “আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, ‘বসেই তো আছ, লেখো তোমার জীবনের কাহিনি।’” একই পৃষ্ঠার এই অংশ শেষ করেছেন এভাবে : ‘আমার স্ত্রী যার ডাক নাম রেণু, আমাকে কয়েকটা খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেণু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।’

    জেন্ডার সমতার সূত্র থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টই বোঝা যায় যে এখানে পারিবারিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে দেশ-জাতির জন্য সময়ের ইতিহাস রচনা দুজনেই গভীরভাবে ভেবেছেন। রাজনীতির কারণে কারাবন্দি স্বামীকে অনুপ্রেরণা দিয়ে উৎসাহিত করেছেন সময়ের ছবি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ধরে রাখার জন্য। সম্পর্কের এই গভীর বোঝাপড়া জেন্ডার সমতার অনন্য উদাহরণ। গ্রন্থের শেষে টিকা অংশে উল্লেখ করা হয়েছে : ‘পাণ্ডুলিপির জন্য ব্যবহৃত খাতাগুলি ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন্স, ঢাকা ডিভিশন, সেন্ট্রাল জেল, ঢাকা, ৯ই জুন ১৯৬৭ ও ২২শে সেপ্টেম্বর ১৯৬৭ তারিখে পরীক্ষা করেন। অপরদিকে লেখককে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ১৭ জানুয়ারি ১৯৬৮ থেকে ঢাকা সেনানিবাসে আটক করা হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, লেখক তাঁর এই আত্মজীবনীটি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৯৬৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে রচনা শুরু করেন।’ বই থেকে পাওয়া এসব তথ্য জেন্ডার সমতার আলোকে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। রেণুর তাগাদা ছাড়া এবং খাতাগুলো প্রদান করা ছাড়া ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি কি রচিত হতো? বঙ্গবন্ধু পুরুষতন্ত্রের আধিপত্যের চিন্তা থেকে রেণুকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি আড়াল করতে পারতেন, কিন্তু করেননি।

    বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় তিনি রেণুর কথা বলেছেন সহযোগিতার সূত্র ধরে। পড়ালেখার সময় কলকাতায় থাকাকালে খরচের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন : ‘আব্বা ছাড়াও মায়ের কাছ থেকেও আমি টাকা নিতে পারতাম। আর সময় সময় রেণুও আমাকে কিছু টাকা দিতে পারত। রেণু যা কিছু জোগাড় করত বাড়ি গেলে এবং দরকার হলে আমাকেই দিত। কোনো দিন আপত্তি করে নাই, নিজে মোটেই খরচ করত না। গ্রামের বাড়িতে থাকত, আমার জন্যই রাখত।’ আর এক জায়গায় নিজের অসুস্থতার প্রসঙ্গে লিখেছেন : ‘আমার জ্বর ভয়ানকভাবে বেড়ে গেছে।…রেণু কয়েক দিন আমাকে খুব সেবা করল। যদিও আমাদের বিবাহ হয়েছে ছোটবেলায়। ১৯৪২ সালে আমাদের ফুলশয্যা হয়। জ্বর একটু ভালো হলো। কলকাতা যাব, পরীক্ষাও নিকটবর্তী।’

    ব্যক্তি সম্পর্কের ঊর্ধ্বে রাজনীতির প্রসঙ্গটিও বঙ্গমাতা নিজের জ্ঞানে স্রোতের সমান্তরালে রেখেছিলেন। সাংবাদিক-লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাঁর স্মৃতিচারণামূলক লেখা ‘স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু পত্নী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব’ প্রবন্ধে লিখেছেন : “৩২ নম্বরে এলে ভাবি প্রায়ই চা নিয়ে ঘরে ঢুকতেন। তিনি জানতেন আমি পেটুক। তাই বঙ্গবন্ধুর জন্য শুধু চা এলেও আমার জন্য সঙ্গে থাকত তাঁর হাতে বানানো মিষ্টি, বিস্কিট, কখনো একটু পুডিং বা এক টুকরো কেক। একদিন ৩২ নম্বরের এই লাইব্রেরি কক্ষে বসেই বঙ্গবন্ধু ভাবিকে দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘একজন নারী ইচ্ছে করলে আমার জীবনটা পাল্টে দিতে পারতেন।’ আর জবাবে আমি বলেছিলাম, ‘তিনি যদি আপনার জীবন পাল্টে দিতেন, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাসও সেদিন পাল্টে যেতো।’ আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে একদিন যেমন শেখ মুজিবের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে, তেমনি হবে মুজিবের পত্নী বেগম ফজিলাতুন নেছারও। তাঁকে ছাড়া বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাস রবে অসম্পূর্ণ।”

    পরিবারের আর একজন সদস্য ড. ওয়াজেদ মিয়া। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর স্বামী। তাঁর বইয়ের নাম ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’।

    অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল সময়। পরিস্থিতি থমথমে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের আলোচনা চলছে। ড. ওয়াজেদ মিয়া ২৩ মার্চের দুপুরের কথা লিখেছেন : ‘ওইদিন দুপুরে বঙ্গবন্ধু কারো সঙ্গে কথা না বলে গম্ভীরভাবে খাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে শাশুড়ি বঙ্গবন্ধুকে বললেন, এতদিন ধরে যে আলাপ-আলোচনা করলে, তার ফলাফল কী হলো কিছু তো বলছ না। তবে বলে রাখি, তুমি যদি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সমঝোতা করো, তবে একদিকে ইয়াহিয়া খানের সামরিক বাহিনী সুবিধামতো সময়ে তোমাকে হত্যা করবে, অন্যদিকে এদেশের জনগণও তোমার উপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হবে। এ কথা শুনে বঙ্গবন্ধু রাগান্বিত হয়ে শাশুড়িকে বলেন, আলোচনা এখনো চলছে, এই মুহূর্তে সবকিছু খুলে বলা সম্ভব না। এই পর্যায়ে শাশুড়ি রেগে গিয়ে নিজের খাবারে পানি ঢেলে দ্রুত উপরতলায় চলে যান।’

    এভাবেই তিনি ইতিহাসের মানুষ। মানবচেতনার কণ্ঠস্বর। গণমানুষের পক্ষের শক্তি। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটকে সঠিক অনুধাবনে নিজের করতলে বিস্তৃত রেখেছিলেন। তিনি জেন্ডার সমতার আলোকে রাজনীতির বিষয়গুলো মোকাবেলা করেছেন।